সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, শোবিজ ও ফিল্ম দুনিয়ায় আলোচিত সিনেমা ‘Barbie’। তবে বার্বি মুভিটা মূলত ১৯৫৯ সালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এক ধরনের পুতুলকে কেন্দ্র করে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বার্বি পুতুল সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, সৌন্দর্যের পরিবর্তন ইত্যাদি নির্দেশ করে। বার্বি হচ্ছে একধরনের প্রতিকী পুতুল, যেটা, নারীর ক্ষমতায়নের সাথে আশেপাশের চিন্তাভাবনা, পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন নির্দেশ করে।
এটা নারীদের শারীরিক সৌন্দর্য, ইতিবাচক, নারীর ক্ষমতা, গায়ের রঙকেও নর্মালাইজ করে। যদিও নারীর ক্ষমতায়ন চিত্রায়ণে বার্বির ভূমিকা অল্প, তবে এটির মূল থিম হচ্ছে, নারীর বিকশিত হওয়া, নারী মুক্তি, যৌন স্বাধীনতা ও ফ্যাশনের প্রতি বাচ্চাদের ছোট থেকেই ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করা।
ঠিক যেমন দ্য রোয়ারিং টুয়েন্টিজ নারী মুক্তির, নারীদের পরিবর্তনের, তাদের চালচলন, ফ্যাশনে পরিবর্তনের একটা পিরিয়ডকে নির্দেশ করে। বার্বি আর দ্য য়য়ারিং টুয়েন্টির মধ্যে মিল হচ্ছে, দুটিই নারীদের মানসিকতা, রুচি, ক্ষমতায়ন পরিবর্তনের একটা গ্রাফিকাল প্রদর্শন। একটি পিরিয়ডিকাল। আরেকটি ট্রেডিশনাল। বার্বির মূল থিম যেখানে একজন শিশুর মধ্যে সমাজ, যৌনতা, ফ্যাশনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করা, যেখানে দ্য রোয়ারিং টুয়েন্টি’র থিম হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তবে পরিবর্তন।

‘দ্য রোয়ারিং টুয়েন্টি’ হচ্ছে এমন একটা সময়কাল, যে সময়ে আমেরিকায় নাটকীয়ভাবে বড় ধরণের ফ্যাশন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে যায়। এসময় পশ্চিমা অনেক দেশে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে থাকে, কর্মক্ষেত্রেও বিপুল পরিমাণ নারীর অনুপ্রবেশ ঘটে, নারীদের স্বাধীনচেতা ভাব ফুটে উঠে। এক কথায় নারীর ক্ষমতায়ন বিকশিত হতে শুরু করে এই সময়টায়।
ফ্যাশন ও সামাজিক পরিবর্তনে ‘দ্য রোয়ারিং টুয়েন্টি’
দ্য রোয়ারিং টুয়েন্টি বা ১৯২০ সালের ফ্যাশন এখনো বিখ্যাত, কারণ সেসময়কার ফ্যাশন পূর্ববর্তী সময়ের ফ্যাশন থেকে পরবর্তী জেনারেশনের ফ্যাশনকে আলাদা করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কম বেশী সব দেশই দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, কাস্টম, সব দিক দিয়েই বিশ্বে পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে এক দেশ হতে আরেক দেশ যাওয়া সপ্তাহের ব্যাপার ছিল, এই সময়ে অটোমোবাইল খাতে উন্নতির ফলে বিমানের মাধ্যমে তা নেমে দাঁড়ায় দিনে।
আসলে ১৯২০ সালের নতুন ও ভিন্ন আঙ্গিকের ফ্যাশন পুরো সমাজের পরিবর্তনটা চিত্রায়িত করেছে। ভিক্টোরিয়ান যুগের সেই পুরনো মেয়েদের রীতিনীতি মেনে চলতে চাইতো না তখনকার মেয়েরা। করসেট বা ক্রিনোলিনের মত ভারী, টাইট ফ্যাশনেবল পোষাক থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে কাজ করতে চাওয়া, নাঁচতে চাওয়া, লং ড্রাইভে যেতে চাওয়া যুবতী নারীরা। তো সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে পোশাক ও ফ্যাশনেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

সেসময়কার নারীদের নিয়ে একটা মিথ প্রচলিত আছে যে, দশকের শুরু হতেই তারা শুধু ছোটখাটো জামা পড়তো। কিন্তু প্রকৃত চিত্র আসলে তা নয়। ১৯২৫ সালের আগ পর্যন্ত তাদের পোশাক হাঁটুর ওপর উঠেনি। এমনকি ১৯২০ সালেও তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ভিক্টোরিয়ান যুগের মত ছিল।
মূলত ১৯১০ সালের পর থেকেই ওয়েস্টার্ন মেয়েদের কটিরেখা নিচে নামতে শুরু করে, ১৯২০ সাল পর্যন্ত। তবে আশ্চর্যজনকভাবে ১৯২৪-২৫ সালে সেটা হাঁটুর কাছাকাছি নেমে যায়। আবক্ষ রেখা নিচে নামানো, বাহু অনাবৃত এসবেরও প্রচলন সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘটে মূলত এই সময়টাতেই।
১৯২০ সালের দিকে তখনকার পোশাকগুলোতে দেহের অবয়ব বুঝা যেত না, বেশ ঢিলেঢালা পোশাকের প্রচলনই ছিল। তবে সেই সময়টাতে ফুলের প্রিন্টের জামাকাপড় বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। নীলচে সবুজ, সূর্যাস্তের মত কমলা, ফ্রেঞ্চ ব্লু, বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে তৈরী পোশাক বেশ জনপ্রিয় ছিল সেসময়।

জিনি লেনভিন, একজন ফ্যাশন ডিজাইনার, তখন সিল্ক আর ভেলভেটের সংমিশ্রণে ‘the rob de style’ নামে একপ্রকার পোশাক অবতারণ করেন। সেসময় এই ড্রেসটা বেশ ভালোরকম সাড়া ফেলে দিয়েছিল। সেসময় সমসাময়িক কিছু ফ্যাশন ডিজাইনার দারুণ দারুণ ডিজাইনের বেশ কিছু ইভিনিং গাউন উদ্ভাবন করেন।
এগুলোই দ্য রোরিং টুয়েন্টির আইকনিক ড্রেস হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। সেসময়কার জনপ্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনার ছিলেন লুসি ব্রুকস, বেবি ডানিয়েল, মারলেন ডিট্রিচ।
আমেরিকার আর্থসামাজিক সূচকে ‘দ্য রোরিং টুয়েন্টি’র প্রভাব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে যেখানে সারাবিশ্বে জনবলের অভাবে অর্থনীতি সহ বিভিন্ন দিক দিয়ে সংকটে ভুগছে, সেখানে আমেরিকা ও কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্র নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে, তাদেরকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়ে সেই সময়টাতেও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অবস্থা বজায় রেখেছে। বরং অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত উন্নতি হচ্ছিল আমেরিকায় বিশের দশকে।

১৯২০ সালের শুরুর দিকের দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সময় আমেরিকা বিশ্ব অর্থনীতির পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় আর সেই সাথে প্রচুর আমেরিকান শহরমুখী হতে শুরু করে। ওটাই ছিল প্রথম, যেসময় প্রথমবারের মতো আমেরিকায় গ্রামের চেয়ে শহরে মানুষের বসবাসের অনুপাত বেশী হলো। প্রচুর আমেরিকান শহরমুখী হতে শুরু করে, তখন আমেরিকার আর্থসামাজিক অবস্থায়ও বড়সড় পরিবর্তন ঘটতে শুরু করলো।
১৯২০ সালের সময়টায়, আমেরিকার অর্থনীতি ক্রমশই ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করে, যার একটা অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে বিদ্যুতায়ন। ১৯১৬ সালে যেখানে আমেরিকার বিদ্যুতায়নের হার ছিল ১২%, সেখানে ১৯২৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩%-এ। ফলে সেসময়টায় অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় আমেরিকার উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল, অটোমোবাইল খাতেও বেশ ভালোরকম উন্নতি করতে শুরু করে। ফলে আমেরিকার পরিবহন খাত খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় সেই সময়টায়।
২০’র দশকে আমেরিকার প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৪২%-এ দাঁড়িয়েছিল। সেই সময় শুধু আমেরিকাতেই বিশ্বের অর্ধেক পণ্য উৎপাদন হতো, যেখানে ইউরোপের বেশীরভাগ রাষ্ট্র তখনো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিমাণ ১৯২০ সালে যেখানে ছিল ৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ১৯২৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণেও এই পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ৬৪৬০ ডলার থেকে এক বছরে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০১৬ ডলারে। আরেকটা ফ্যাক্ট হচ্ছে, ১৯২২ সালে আমেরিকার টপ ১% জনগণের আয় ছিল মোট ইনকামের ১৩.৪%, যা ১৯২৯ সালে ১৪.৫%-এ ঠেকে। এ থেকে বোঝা যায় যে, সেসময় আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও তা কিছু সংখ্যক মানুষের কুক্ষিগত হয়ে ছিল না।
দ্য রোরিং টুয়েন্টি কী নারী স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত?
১৯২০-২৯ সাল ছিল সামাজিকভাবে নারীদের পরিবর্তন এর একটি দশক। এই সময়টায় বিপুল পরিমাণ নারী কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেন। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়া পুরুষদের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ হওয়ায় অর্থনীতি সচল ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে নিজের পদেই আসীন ছিলেন, যার কারণে কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত জনবলের জন্য নতুন নতুন আইডিয়া আনতে শুরু করে।
যুবতী মেয়েরা তাদের এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা উপভোগ করতে শুরু করে, নিজের টাকা দিয়ে জন্মনিরোধক কিনতে শুরু করে, যে কারণে সেক্সুয়াল ফ্রিডমের স্বাদও গ্রহণ করতে শুরু করে সেসময় (উল্লেখ্য যে প্রথম জন্মনিরোধক পিল ১৯১৬ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়)।

আবার ১৯২০ সালে আমেরিকার নারীরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার লাভ করে। এতে নিজেদের মতামত প্রকাশ করার পাশাপাশি জাতীয় সিদ্ধান্তেও অবদান রাখতে শুরু করে তারা। তো বলা যায় যে, নারীর ক্ষমতায়নের সাথেও ‘দ্য রোয়ারিং টুয়েন্টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
Feature image source: Getty image References: 01. Roaring Twenties. 02. Roaring Twenties History. 03. 1920s. 04. Roaring Twenties. 05. 1920s Fashion. 06. 1920.