এলিজাবেথ আলেকজান্দ্রা মেরি ওরফে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। বাবা-মা আদর করে যাকে ডাকতেন লিলিবেট। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকাল শাসনকারী এই সম্রাজ্ঞী গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে স্কটল্যান্ডের ব্যালমোরাল প্রাসাদে মারা যান।
ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের আরো ১৩টি সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহের রানি ও রাষ্ট্র প্রধান ‘প্রিন্সেস এলিজাবেথ অব ইয়র্ক’ খ্যাত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। তিনি মোট ৭০ বছর ২১৪ দিন সিংহাসনে ছিলেন।
জীবদ্দশায় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ একাধারে যুক্তরাজ্যের শাসনকর্তা এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ডের প্রধান ছিলেন। এছাড়াও, তিনি ১৫টি কমনওয়েলথ রাষ্ট্রের প্রধান এবং ৫৪ সদস্য বিশিষ্ট কমনওয়েলথ অফ নেশনসেরও প্রধান ছিলেন।
তাঁর অনুমতি এবং স্বাক্ষর ছাড়া ব্রিটেনে কোন আইন পাশ হতো না। ইংল্যান্ডের সরকার গঠনের ক্ষমতা একমাত্র তাঁর-ই ছিল। এমনকি সাংবিধানিক সংকটকালে মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে ‘ভেটো’ জারি করার ক্ষমতা ছিল শুধু রানির।
জাতিসংঘের কোনো সম্মেলনে যখন বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান ও রাষ্ট্র প্রধানরা হাঁটতেন, তখন তার সামনে কেউ হাঁটতেন না। সবসময় এক দুই কদম পেছনে হাঁটতেন তারা। এমনকি বর্তমান বিশ্ব পরাশক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্টরাও তার সামনে হাঁটতেন না।
এত এত ক্ষমতা ছিল যে রানির, তার কিন্তু রানি হওয়ার কথাই ছিল না। রুপকথার রানিদের মতো তার হয়তো ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু তার রানি হওয়া জার্নিটা ছিল অনেকটা রুপকথার গল্পের মতোই।
এলিজাবেথ আলেকজান্দ্রা মেরির কখনোই রানি হওয়ার কথা ছিল না। রাজা হওয়ার কথা ছিল না তার বাবা প্রিন্স অ্যালবার্টের। কারণ তিনি ছিলেন রাজা পঞ্চম জর্জের ছোট ছেলে।
ব্রিটিশ রাজ পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী পঞ্চম জর্জের বড় ছেলে হিসেবে ১৯৩৬ সালে ৪০ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। কিন্তু অষ্টম এডওয়ার্ড বিয়ে করেছিলেন দুবার বিয়ে ভেঙে যাওয়া আমেরিকান মহিলা ওয়ালিস সিম্পসনকে। ওয়ালিসকে বিয়ে করায় এডওয়ার্ডের উপর মনক্ষুণ্ণ হয় রাজপরিবার। এছাড়া, চার্চ অফ ইংল্যান্ডও এই বিয়ের বিরোধিতা করায় একই বছরের ডিসেম্বরে সিংহাসন ছাড়তে হয় এডওয়ার্ডকে।
যে কারণে কপাল খুলে যায় প্রিন্স অ্যালবার্টের। ১৯৩৬ সালে প্রিন্স অ্যালবার্ট সিংহাসনে বসেন। অ্যালবার্টের কোনো ছেলে না থাকায় তার মৃত্যুর পর ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২৫ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহন করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সেই তো ছিল মাত্র শুরু। এরপরের ইতিহাস সুদীর্ঘ ৭০ বছরের।
রানির এই সুদীর্ঘ জীবনে ইতিহাসের বেশ কিছু নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন। সেই সাথে ইংল্যান্ডের তো বটেই। নিজের চোখের সামনে দেখেছেন রাজ পরিবারের সদস্যদের বিবাহ-বিচ্ছেদ, প্রিন্সেস ডায়নার অস্বাভাবিক মৃত্যু, প্রিন্স হ্যারি আর মেগানের রাজপ্রাসাদ ত্যাগ।
তার ৭০ বছরের শাসনামলে ১৫ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে প্রথম ছিলেন উইনস্টন চার্চিল এবং সর্বশেষ লিজ ট্রাস। এত সংখ্যক প্রধানমন্ত্রী এখন পর্যন্ত কোনো রাজ শাসনকর্তার অধীনে দায়িত্ব পালন করেনি।
তিনি একই সাথে ভাঙা-গড়া দেখেছেন। তিনি কোরিয়ান যুদ্ধে দুই কোরিয়ার বিভক্তি দেখেছেন, আবার বার্লিনের প্রাচীর ভেঙে দুই জার্মানির একত্রীকরণও দেখেছেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন, আমেরিকা আর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ু যুদ্ধও দেখেছেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন দেখেছেন। তার শাসনামলেই সোভিয়েত ইউনিয়নের দায়িত্বে ছিলেন জোসেফ স্টালিন। তিনি দেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যা, সর্বশেষ করোনা মহামারিতে পৃথিবীর থমকে যাওয়া।
এর মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় কখনো তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে আবার কখনো তাকে নিয়ে জনসাধারণের মাঝে বিতর্ক শোনা গিয়েছে। তবে সব বিতর্ককে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়েছেন। কোনো কিছু কখনোই তার যাত্রাপথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
তিনি তার নিজ কর্তব্য সঠিকভাবেই সামলে এসেছেন বছরের পর বছর। নানা রকম বিরূপ পরিস্থিতিতে তিনি সবকিছু শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি অসাধারণ দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে এসেছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের এক বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, ‘তার (রানির) চরিত্রে যে কর্তৃত্ববোধ ছিল, তা একজন শিশুর পক্ষে ছিল খুবই আশ্চর্যজনক।’
রানি এলিজাবেথ সারাজীবন কাজ করে গেছেন রাজপরিবারের প্রতি ব্রিটিশ জনগণের মনে ভালবাসা চিরস্থায়ী করতে। তিনি বলেন—
আমার বয়স যখন ২১, আমি অঙ্গীকার করেছিলাম আমার জীবন আমি উৎসর্গ করবো আমার জনগণের সেবায়। আমি এই প্রতিজ্ঞা রক্ষায় ঈশ্বরের সাহায্য কামনা করেছিলাম। আমার বয়স তখন ছিল অল্প, আমার বিচারবুদ্ধি পরিপক্ক ছিল না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমি কখনো অনুতাপ করিনি। আমি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে কখনও একচুলও সরে আসিনি।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জীবনযাপন সম্পর্কে রাজপরিবারের বাইরের সাধারণ মানুষ খুব কমই জানে। রানি চাননি বাইরের মানুষ রাজপরিবারের সদস্যদের দৈন্দদিন জীবনযাপন সম্পর্কে জানুক। তাই, রাজপ্রাসাদে কেউ কখনো ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করতে পারতো না। যদিও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিলো। তবে, তা কেবল একবারই।
রানি এলিজাবেথের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু তিনি পারিবারিক আবহে পড়াশোনা শিখেছেন। ভাষার প্রতি তার ভালো দখল ছিল এবনং তিনি সাংবিধানিক ইতিহাস পড়েছিলেন বিস্তারিতভাবে।
১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর তিনি গ্রিসের যুবরাজ প্রিন্স ফিলিপকে বিয়ে করেন। বিয়ের এক বছর পর ১৯৪৮ সালে তাদের প্রথম পুত্র চার্লস এবং ১৯৫০ কন্যা অ্যানের জন্ম হয়।
লন্ডনে রানির সরকারি বাসভবনের নাম বাকিংহাম প্যালেস। এতে মোট ৭৭৫টি কক্ষ রয়েছে। বাকিংহাম প্যালেসকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি বাড়ি বলে মনে করা হয়। এর আনুমানিক মূল্য ১০৩ কোটি ডলার।
ধারণা করা হয়, রানির ব্যক্তিগত সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য ৫০ কোটি ডলার। যার মধ্যে মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন ৭ কোটি ডলার মূল্যের পারিবারিক সম্পত্তি।
রানী এলিজাবথের রয়েছে কিছু বিশেষ ক্ষমতা যা পৃথিবীর অন্য কোন ব্যক্তির নেই। যেমন:
১. পৃথিবীর যেকোনো দেশে যাতায়াতের জন্য রানির কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন ছিল না। পাসপোর্ট ছাড়াই তার বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যাতায়াত করার ক্ষমতা ছিল।
২. গাড়ি চালানোর জন্য রানির কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স-এর দরকার ছিল না।
৩. রানিকে কর দিতে হতো না।
৪. টেমস নদীতে যতগুলো হাঁস আছে, সবগুলোই ছিল রানির।
৫. ব্রিটেনের জলাশয়ে যে কয়েকটি ডলফিন আছে সবগুলোর মালিকানা রানির।
৬. পৃথিবীর কোন আদালতের রানি এলিজাবেথের বিচার করার ক্ষমতা ছিল না।
৭. রানি এলিজাবেথের একজন ব্যক্তিগত কবি ছিলেন, যিনি রানিকে নিয়ে কবিতা লিখতেন।
৮. রানীর নিজস্ব এটিএম মেশিন ছিল। রাজপরিবারের কেউ এই মেশিন ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই রানির অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করতে হতো।
৯. নাইটস এবং লর্ডসদের নির্বাচন করার ক্ষমতা একমাত্র রানির।
১০. অস্ট্রেলিয়ার গোটা সরকারকে মুহূর্তের মধ্যে বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখতেন রানি এলিজাবেথ।
রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেছেন রানির বড় ছেলে রাজা তৃতীয় চার্লস। রাজা তৃতীয় চার্লসের স্ত্রী হিসেবে রানির মর্যাদা পাবেন ক্যামিলা। তবে তাকে পূর্ণ রানি না বলে কুইন কনসর্ট বলা হবে।
Feature Image: References: 01. Elizabeth-II. 02. Queen Elizabeth II Powers Privileges. 03. Queen Elizabeth II has died.