The country that ate itself.
যে দেশটি নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলেছে।
যদিও কথাটা প্রতীকি। তবুও স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে-একটা দেশ কিভাবে নিজেই নিজেকে খেতে পারে? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে পৃথিবীতে এমন এক দেশ ছিল যে দেশের নিঃস্ব হওয়ার কারণ সেই দেশ নিজেই। আজকের আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় নাউরু নামক দেশ নিয়ে।
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি ভৌগোলিকভাবে ওশেনিয়া মহাদেশের মাইক্রোনেশিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। ভ্যাটিকান সিটি এবং মোনাকোর পর নাউরু বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। যার আয়তন মাত্র ২১.৩ বর্গকিলোমিটার।
দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। নাউরু পৃথিবীর একমাত্র দেশ যার কোন রাজধানী নেই। তবে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজধানী না থাকলে ইয়ারেনকেই তারা রাজধানী হিসেবে গণ্য করে।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা এই দেশটি একসময় বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী দেশ ছিল। জিডিপির দিক দিকে একমাত্র সৌদি আরব ছিল নাউরুর উপরে।
১৯৭৫ সালে নাউরুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ ছিল ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা নাউরুকে কুয়েতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করে। সেজন্য নাউরুকে বলা হতো পাশ্চাত্যের কুয়েত।
তবে নাউরুর জনগণের কপালে এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই দশকের মাথায় নাউরু বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী দেশ থেকে পরিনত হয় একটা ভাড়াটে রাষ্ট্রে কিংবা গরীব রাষ্ট্রে।
কি এমন হয়েছিল যার জন্য নাউরু নামক দেশটিকে এখন অন্য দেশের টাকায় চলতে হয়? দেশটির এতো ধনী হওয়ার পেছনেই বা কি কারণ ছিল? জানতে হলে ডুব দিতে হবে নাউরুর অতীত ইতিহাসে।

নাউরু নামক দেশটি একসময় দ্বীপ ছিল। পৃথিবীর অনেক দেশই একসময় দ্বীপ ছিল। যা পরে রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে। নাউরু তন্মধ্যে একটি। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে দ্বীপটির অবস্থান হওয়ায় কয়েক কোটি বছর ধরে এটি সামুদ্রিক পাখিদের অভয়ারণ্য ছিল।
হাজার হাজার বছর ধরে সেখানে পাখিদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য জমতে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে, পাখিদের বর্জ্য তুচ্ছ পদার্থ হলেও কালক্রমে এটিই হয়ে দাঁড়ায় নাউরুর জনগণের জন্য আশীর্বাদস্বরুপ।
যেহেতু পাখিদের মলে প্রচুর পরিমান ফসফেট থাকে, তাই সামুদ্রিক পাখিদের বর্জ্য জমতে জমতে একসময় সেখানে উৎকৃষ্টমানের ফসফেটের টিলা গড়ে উঠতে থাকে।
ফলে কয়েক হাজার বছর ধরে জমা হওয়া বর্জ্য হাজার হাজার টন ফসফেটে পরিণত হয়। এই ফসফেটই বদলে দেয় নাউরুর জনগণের জীবন।
কারণ কৃষিকাজের জন্য ফসফেট অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। কৃষি জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার তৈরিতে ফসফেট প্রয়োজন।
তাছাড়া, বিস্ফোরক তৈরীতেও ফসফেট ব্যবহৃত হয়। আর নাউরুতে যে ফসফেট পাওয়া যেতো তা ছিল শতকরা ৮০-৯০% বিশুদ্ধ। প্রকৃতির কি অপার বিস্ময়-একটা দেশের যেখানে ফসলি জমির পরিমাণ নেই বললেই চলে, অথচ সেই দেশটির কাছে আছে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সর্বোৎকৃষ্ট উপাদানটি।
জমিতে প্রচুর পরিমাণে ফসফেট থাকার কারণে এখানকার লোকেরা জমিতে নানা ধরনের ফসল উৎপন্ন করতো। কারণ ফসফেট থাকার কারণে ফসলের ভালাে ফলন হতো।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মানি কর্তৃক নাউরু দখল হলে, ১৯০৬ সালে সর্বপ্রথম নাউরুর ফসফেট খনির সন্ধান মেলে। জার্মানি ‘প্যাসিফিক ফসফেট কোম্পানি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এখান থেকে ফসফেট উত্তোলন শুরু করে।
১৯০৭ সাল থেকে ফসফেট নাউরুর অর্থনীতির প্রধান উৎস হিসেবে এটি বিবেচিত হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা পরাজিত হলে দ্বীপটি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের অধীন একটি ম্যান্ডেটে পরিণত হয়।
যুদ্ধশেষে নাউরুর ফসফেট তোলার দায়িত্ব পায় ‘ব্রিটিশ ফসফেট কমিশন’। এই কোম্পানি কর্তৃক ফসফেট উত্তোলন চলতে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন বিস্ফোরক তৈরিতেও নাউরুর ফসফেট ব্যবহৃত হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাউরু চলে যায় জাপানের অধীনে। যুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে নাউরু আবার ঐ তিন দেশের প্রশাসনিক এলাকায় পরিণত হয়।
অবশেষে ১৯৬৮ সালে দেশটি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। তবে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এখান থেকে ফসফেট উত্তোলন করে।
স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭০ সালে ২১ মিলিয়ন ডলার দিয়ে নাউরু সরকার ফসফেট কোম্পানিটি কিনে নিয়ে তার নাম দেয় ‘নাউরু ফসফেট কর্পোরেশন’। এরপর পুরোদমে চলতে থাকে নাউরুর ফসফেট উত্তোলন। যার প্রধান ক্রেতা ছিল পশ্চিমের বিভিন্ন দেশ।
ফসফেটের কারণে খুব সহজেই নাউরু সরকারের হাতে আসতে থাকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। ১৯৭০-১৯৮০’র দশক পর্যন্ত দেশটিতে চলতে থাকে ফসফেটের এই রমরমা ব্যবসা। ফসফেট বিক্রি করে দুই দশকের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশে পরিনত হয় নাউরু।
১৯৭৫ সালের মধ্যে নাউরুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! স্বাধীনতার পর এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া যেকোনো রাষ্টের কাছে স্বপ্নের মতো। হাতে এতো অর্থ পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে দেশটির সরকারসহ সাধারণ জনগণ।
দেশের উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা না করে তারা ঝুঁকে পড়ে ভোগবিলাস আর আরাম আয়েশি জীবনযাত্রার প্রতি। ফসল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি শুরু করে।
সেসব খাদ্য দেশে নিয়ে আসার জন্য কেনা হয় সাতটি বোয়িং বিমান। সেসব বিমান দিয়ে আবার নাউরুর জনগণ ফিজি, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে মার্কেট করতে যেতো!
নাউরুর জনগণ ফসফেট খনিতে কাজ করতো না। কাজ করতো চীন, ফিলিপাইন ও কিরিবাতি থেকে আসা শ্রমিকেরা।
তবে ফসফেট বিক্রির একটা অংশ তারা পেতো। জনগণকে কোনো ট্যাক্স দিতে হতো না। তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, যানবাহন সবই ছিল সরকারের তরফ থেকে ফ্রি।
তাছাড়া, ফসফেট বিক্রির একটা অংশ দিয়ে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাভজনক বিনিয়োগ করতো। এসবের মধ্যে ছিল হোটেল, ফ্ল্যাট, গলফ মাঠ, ফসফেট কোম্পানি ইত্যাদি। মোটকথা, জীবনযাত্রার মানের দিক দিয়ে তারা পাশ্চাত্যের দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। দেশের টাকায় সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করে।
তবে তখন তাদের উচিত ছিল এই অর্থ দেশের উন্নয়নের জন্য খরচ করা। অথচ তখন তারা বিদেশে বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ করে অর্থ পাচার করতে থাকে। অর্থাৎ দেশটি অতিরিক্ত অর্থ দেখে দুর্নীতির চোরাবালিতে নিমজ্জিত হয়ে যায় নিজেরই অজান্তে।
উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থানের পরিবর্তে দুর্নীতি, অবাস্তব পরিকল্পনা নাউরুকে নিঃস্ব করে দিতে শুরু করে। নাউরুর রাজনীতিবিদরা ভেবেছিল তাদের এই সম্পদ শেষ হওয়ার নয়।
১৯৮২ সালে নাউরুর সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেছিলেন,
ফসফেট শেষ হয়ে গেলেও নাউরুর বিলিয়ন ডলার থাকবে, যা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। তা দিয়ে একইরকমভাবে জীবন চালানো যাবে। এমনকি জনসংখ্যা আরও বেশি হলেও সমস্যা হবে না।
কিন্তু খনিজ সম্পদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এক সময় এটি শেষ হয়ে যায়। হলোও তাই। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নাউরুর ফসফেট উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়।

পূর্বের ন্যায় ভোগ বিলাসী জীবন চালু রাখতে সরকার তাদের জমানো অর্থ বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। তবে ব্যাপক দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার ফলে বৈদশিক বিনিয়োগগুলো লোকসানে পরিনত হয়। যার ফলে নাউরুর অর্থনীতি ধসে পড়ে।
এদিকে দেশটিতে বসবাসরত সাড়ে ১১ হাজার বাসিন্দাদের জন্য খাদ্য আমদানী করতে সরকারকে অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান হারে সুদে আসলে বাড়তেই থাকে। এমতাবস্থায় মাত্র কয়েক দশক আগের বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী দেশটি ঋণ মেটানোর জন্য একটি ব্যান্ড দলের সাহায্য নেয়।
নাউরুর একজন অর্থ বিশেষজ্ঞের পরামর্শতে দেশটির সরকার লন্ডনভিত্তিক ব্যান্ড ‘ইউনিট ফোর প্লাস টু’কে দিয়ে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। মাত্র দু’সপ্তাহ চলার পর সেই অনুষ্ঠানও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সেইসঙ্গে নাউরুর ঘাড়ের ওপর পড়ে ৭ মিলিয়ন ডলারের ঋণ।
কনসার্ট আয়োজকরা তাদের অর্থের জন্য চেপে ধরে নাউরু সরকারকে। এক পর্যায়ে নাউরু সরকার ঘোষণা দেয়, ২০ হাজার ডলারের বিনিময়ে যে কেউ নাউরুতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। সেই সুযোগে সোভিয়েত ইউনিয়নের মাফিয়ারা প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচার করে বসে। যার কারণে পথে বসতে বাধ্য হয় পুরো নাউরু জাতিকে।

দিনে দিনে নাউরুর অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার নাউরুতে উদ্বাস্তু শিবির প্রতিষ্ঠা করে। যারা কঠিন কোনো অপরাধ করে অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে আসতো, অস্ট্রেলিয়ার সরকার তাদেরকে নাউরুতে পাঠিয়ে দিতো।
এজন্য নাউরুকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতো অস্ট্রেলিয়া সরকার। কিন্তু নাউরুতে যেখানে সামান্য পানির জন্য মারামারি করা লাগে সেখানে কয়েদিদের জীবনের নিরাপত্তার তো প্রশ্নই ওঠে না।
অবশেষে ২০০৮ সালে সেই উদ্বাস্তু শিবির বন্ধ করে দিয়ে কিছুটা উন্নতি করে ২০১৪ সালে পুনরায় চালু করা হয়। কিন্তু অবস্থা সেই আগের মতোই থেকে যায়।

বর্তমানে নাউরুর কাছে ২১ বর্গ কিলোমিটারের জমি আছে। কিন্তু এর কোথাও ফসল আবাদ করা সম্ভব না। ফসফেট উত্তোলনের জন্য মাত্রাতিরিক্ত খোঁড়াখুঁড়ির ফলে দেশটির প্রায় ৯০% জমিই চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সমুদ্রের পানির সাথে ফসফেট মিশে আশেপাশের সব পানি দূষিত হয়ে পড়েছে।
এখন নাউরুবাসী যে চাষাবাদ করে খাবে, তার ও কোনো উপায় নেই। একে তো ফসফেট শেষ তার উপর পরিবেশের বিপর্যয়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গাছগাছালি নেই। সেখানে নিয়মিত খরা চলে। ফসফেটের খনির কারণে দ্বীপের জলবায়ুও পরিবর্তন হয়ে গেছে।
তাছাড়া, পূর্বে জনগণ ফসফেট বিক্রির একটা অংশ পেতো বলে কৃষিকাজ ছেড়ে দেয়। বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করায় সবজি আর মাছের বদলে তারা খেতে শুরু করে টিনজাত মাংস, চিপস, বিয়ার। এসব খাওয়ার ফলে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিকস, কিডনি ও হার্টের সমস্যা জনিত রোগগুলো দেখা দিতে থাকে।

তবে আশার কথা হলো সাম্প্রতিক সময়ে নাউরুর অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পুনরায় দ্বিতীয় স্তরের ফসফেট আবিষ্কৃত হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হতে শুরু করেছে। পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং, মৎস্য শিকার ও বৈদেশিক সহায়তার ফলে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশটি।
কারো দুর্দশাই চিরকাল থাকেনা। নাউরুরও হয়তো একসময় তাদের এই দুরাবস্থা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু তাদেরকে মাথায় রাখতে হবে ব্যাংকে বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রাখা একটা দেশের অর্থনীতির জন্য কখনোই স্থায়ী সমাধান হতে পারেনা। প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি আর মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। নাউরুর এই অবস্থা থেকে সব দেশেরই শিক্ষা নেওয়ার আছে।
Image Source: Pinterest.com Reference: 01. Nauru. 02. A pacific island nation is stripped of everything. 03. Dark History Nauru. 04. An economic tale from a country that had no Plan B. 05. Feature Nauru from economic goldmine to refugee hell.