কর্মব্যস্ত দিন শেষে বাসায় এসে আপনি সোফায় আপানার শরীর এলিয়ে দিলেন, হাতে রিমোট নিয়ে চালু করলেন একটি চ্যানেল। দেখলেন সেখানে আপনার বেশ পছন্দের একটি মুভি শুরু হয়েছে। আপনি দেখতে থাকলেন। হঠাৎ করেই আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটি কোম্পানির ম্যাংগো জুসের প্রচারণার ভিডিও। যা দেখে আপনার জুসটি খেতে ইচ্ছে করলো এবং আপনি পণ করলেন আগামীকাল বাসা থেকে বের হলে অবশ্যই জুসটি খাবেন। এই প্রচারণামূলক ভিডিওটি হলো বিজ্ঞাপন।
বিজ্ঞাপনের ধারণা বহু প্রাচীন। পণ্যের পরিচিতি ও বিক্রি বাড়াতে বিজ্ঞাপনের বিকল্প নেই। পণ্যের প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম হলো বিজ্ঞাপন। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলেছে বিজ্ঞাপনের ধারণা। কিন্তু কখনো কি ঘেঁটে দেখেছেন বিজ্ঞাপনের সুত্রপাত কীভাবে ঘটেছে? বিজ্ঞাপনের ইতিহাসটাই বা আসলে কেমন?
বিজ্ঞাপনের সূত্রপাত
অতীত এবং বর্তমানের বিজ্ঞাপনগুলি আপনি খেয়াল করলে দেখবেন যে, বিজ্ঞাপনগুলি একই ধাঁচের তবে তাদের ফর্মগুলি আলাদা। প্রাচীনকালে বিক্রেতারা মৌখিকভাবে বাজারে তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতো। পরে, তারা খোদাই করা চিহ্ন এবং পতাকার ব্যবহার করা শুরু করে। এতে করে তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে আরও বেশি সাড়া পেতে শুরু করে। ফলে পণ্যের বিক্রি বৃদ্ধি পায়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রথম লিখিত বিজ্ঞাপনটি মিশরের থিবসের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গেছে। এটি একটি প্যাপিরাস ছিল। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে একজন ক্রীতদাসদের মালিক পলাতক ক্রীতদাসকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিল একই সাথে তার তাঁতের দোকানের প্রচার করার জন্য এটি ব্যবহার করেছিল। সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞাপনের পদ্ধতিগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা দেখে নেওয়া যাক।

শুরুর শুরু ( ১৭০০-১৯০০ সাল)
প্রাক ডিজিটাল যুগে, কোম্পানিগুলোর জন্য প্রিন্টিং এবং আউটডোর বিজ্ঞাপনই ছিল কাস্টমারদের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। আউটডোর বিজ্ঞাপন ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ নামেই বর্তমানে পরিচিত। এর মানে হচ্ছে, ধরুন আপনি একটি দোকান থেকে একটি জামা কিনলেন, দাম অনুযায়ী জামার কাপড়ের কোয়ালিটি বেশ ভালো। রং টাও টেকসই। যেই আপনার কাছে কাপড় কেনার ভালো দোকান সম্পর্কে সাজেশন চাচ্ছে, আপনি পরবর্তীতে তাদের কাছে এই দোকানটি সাজেস্ট করলেন। তৎকালীন সময়ে লং লাস্টিং অ্যাডভারটাইজমেন্টের তেমন কোন উপায় না থাকায় নতুন কাস্টমারকে খুঁজে পাওয়ার এটাই একমাত্র উপায় ছিল।
প্রথম সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ১৭০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপরে ১৮০০-এর দশকের গোড়ার দিকে, বিলবোর্ডগুলি অস্তিত্বে আসে এবং ব্র্যান্ডগুলি টাকা দিয়ে বিলবোর্ড ভাড়া করে তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করে।
ডিরেক্ট অ্যাডভারটাইজিং সোজা বাংলায় সরাসরি বিজ্ঞাপন, যা পণ্যের প্রচার সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে সরাসরি পৌঁছায়, এই মেথড ইন্টারনেট আবিস্কারেরও বহু পূর্বে একটি ব্যয়বহুল বিকল্প হিসাবে বিবেচিত হতো। অনেক প্রতিষ্ঠান পরোক্ষ বিজ্ঞাপন পছন্দ করতো কারন এটি আরও সাশ্রয়ী ছিল। পরোক্ষ বিজ্ঞাপন একটি সূক্ষ্ম উপায়ে একটি পণ্য বা পরিষেবার প্রচার করে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি দোকানের সামনে যেকোনো চিহ্ন যা আমাদের চোখে পড়ে এবং পোস্টারগুলি পরোক্ষ বিজ্ঞাপন হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
১৮৯২ সালে সিয়ার্স প্রথম কোম্পানি যারা সরাসরি বিজ্ঞাপনের উপর বেশি গুরুত্ব দেয় যখন তারা তাদের প্রথম সরাসরি মেইল ক্যাম্পেইন শুরু করে। কোম্পানিটি আট হাজারেরও বেশি পোস্টকার্ড পোস্ট করেছিল যা দুই হাজার নতুন অর্ডার তৈরি করেছিল। এটি অন্যান্য সংস্থাগুলিকে আরও বিজ্ঞাপন বাজেট বরাদ্দ করতে উৎসাহিত করেছিল।

বিজ্ঞাপনের স্বর্ণযুগ (১৯০০ থেকে ২০০০ সাল)
রেডিও স্টেশন এবং টেলিভিশন আবিষ্কার হলে বিজ্ঞাপনের পদ্ধতি একদম নতুনভাবে মোড় নেয়। কারন ২০ শতকের শুরুতে, বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০ পারসেন্টেরও বেশি সেই সময়ে রেডিও শুনতো এবং টেলিভিশন দেখতো। এই সময়ে, বিজ্ঞাপনগুলি আরও বেশি পারসোনালাইজড হতে শুরু করে কারণ এসব মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের দ্বারা যোগাযোগ তখন সরাসরি গ্রাহক এবং ব্র্যান্ডের মধ্যে হতে শুরু করেছিল।
রেডিও বিজ্ঞাপন ১৯২২ সালে চালু করা হয়েছিল। এটি বিজ্ঞাপন এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য বিশাল একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। রেডিও শ্রোতাদের কাছে ব্রান্ডগুলো তাদের অনন্য বিক্রয় প্রস্তাব (ইউএসপি) সরাসরি পৌঁছে দিতে পারতো। বিজ্ঞাপনদাতারা তা বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের বিনিময়ে রেডিও স্টেশনগুলিকে নির্দিষ্ট পরিমানে অর্থ দিতো।
১৯৪১ সালে প্রথম টেলিভিশনে বাণিজ্যিক সম্প্রচারের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা শুরু করে। বুলোভা ওয়াচ কোম্পানি প্রথম টিভি বিজ্ঞাপন প্রচার করে, যেটি ১০ সেকেন্ডের ছিল এবং নিউইয়র্কে ৪ হাজার লোক দেখেছিল। বিজ্ঞাপনের স্বর্ণযুগের সূচনা এভাবেই হয়েছিল, যেখানে কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনে প্রচুর বিনিয়োগ করা শুরু করেছিল। এতে তাদের ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি প্রকাশ করতে বেশ সুবিধা হতো এবং তাদের টার্গেট কাস্টমারদের সাথে বেশ ভালোভাবে কানেক্ট হতে পারতো। ১৯৫০ সালে, ব্র্যান্ডগুলি তাদের দর্শকদের সাথে আরও বেশি কানেক্টেড হওয়ার জন্য বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন বিখ্যাত ক্যারেক্টার নিয়ে কাজ করা শুরু করে।
উদাহরণস্বরূপ, ফ্রস্টেড ফ্লেক্স ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল প্রচারের জন্য কেলগ কার্টুন মাস্কট টনি দ্য টাইগার প্রবর্তন করেছিল। অনেক ব্র্যান্ড শুধুমাত্র পণ্যের বিক্রির উপর কাজ না করে বরং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের ব্র্যান্ড সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে।
এমনকি টিভি এবং রেডিওর ব্যাপক জনপ্রিয়তার সাথেও, বিজ্ঞাপনদাতারা এখনও সংবাদপত্র এবং বিলবোর্ডের সাথে অফলাইন বিজ্ঞাপন দেয়। তারপরে ইন্টারনেট এসেছিল, যা বিজ্ঞাপনের জন্যে আরো একটি দ্বার খুলে দেয়।

অনলাইন বিজ্ঞাপন (২০০০ সাল – বর্তমান)
ইন্টারনেটের ব্যবহার ২০ দশকের শুরু থেকে ব্যাপক হয়ে ওঠে। ব্র্যান্ডগুলি তাদের পণ্যের প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটকে দারুণ সুযোগ হিসেবে লুফে নেয়। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা প্রথাগত অফলাইন চ্যানেলের পরিবর্তে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে।
প্রথম অনলাইন বিজ্ঞাপনটি ১৯৯৪ সালে ওয়েবসাইটের ল্যান্ডিং পেইজে একটি ব্যানার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনলাইনে বিজ্ঞাপনের পথচলা। যদিও ব্র্যান্ডগুলি প্রাথমিকভাবে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, পরবর্তীতে ইয়াহু বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য একটি সহজ উপায় তৈরি করেছে।
ইয়াহু বিজ্ঞাপনদাতাদের আকৃষ্ট করার জন্য পে-প্রতি-ক্লিক মডেল চালু করে। এতে করে যতটুকু প্রয়োজন, বাজেট অনুযায়ী ঠিক ততটুকু খরচ করে বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়। ইয়াহু এই সময়ে সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারকারীদের আরও বেশি আকৃষ্ট করার জন্য কীওয়ার্ড-ভিত্তিক বিজ্ঞাপনও চালু করেছিল। কীওয়ার্ড হলো এমন শব্দ বা বাক্যাংশ যা লোকেরা তাদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যবহার করে।
মোবাইল ডিভাইস থেকে ইন্টারনেট আরও অ্যাক্সেসযোগ্য হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ফরম্যাট চালু করা হয়েছিল। বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের পছন্দের ডিভাইসগুলোতে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য মোবাইল বিজ্ঞাপন তৈরি করা শুরু করে।

মোবাইল বিজ্ঞাপন (২০০৮ – বর্তমান)
প্রথম মোবাইল বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় ২০০০ সালের গোড়ার দিকে। এসএমএস এর মাধ্যমে পণ্যের প্রচার করা শুরু হয়। এটি মোবাইল মার্কেটিং-এর একটি অংশও বটে। ৩জি ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর মোবাইল বিজ্ঞাপন নতুন রূপ ধারণ করে, বিজ্ঞাপনদাতারা ইন-অ্যাপ্লিকেশন বিজ্ঞাপনে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ১৯৭০ এর গোড়ার দিকে, ইমেইল বিজ্ঞাপন চালু হয়। ইমেইলের মাধ্যমে, ব্র্যান্ডগুলো আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারছে আরও সহজ এবং সাশ্রয়ী উপায়।
বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যৎ ইতিহাস তাহলে কেমন হবে?
এতক্ষণ আমরা তো বিজ্ঞাপনের অতীত ইতিহাসটাই জেনেছি। কেমন হয় যদি আপনি বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যৎ ইতিহাস জানতে পারেন? বর্তমান শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিস্কার হিসেবে আমাদের মাথায় যে নামটি আসবে তা হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিজ্ঞাপনের নতুন যুগে প্রবেশ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টেকনোলজিই সবকিছু রাখতে পাবে হাতের মুঠোয়। তবুও এই ডিজিটাল যুগ কতদিন টেকসই হবে তাহলে? ভাবনাটা আপনাদের জন্যেই তোলা থাকলো। আজ এ পর্যন্তই!
Feature Image: pixabay.com References: 01. History of Advertising 101: What You Need to Know. 02. THE ENTIRE HISTORY OF ADVERTISING. 03. History of Advertising: Definition and Complete Timeline. 04. The History and Evolution of Advertising.