ক্লাব হিসেবে এসি মিলানের দিন কাটছিল খুবই বাজেভাবে৷ মূল স্ট্রাইকার ক্রিস্তফ পিওন্তেক গোলের দেখা পাচ্ছিলেন না। এমন সময় ৩৮ বছর বয়সী খেলোয়াড়কে দলে ভেড়ায় এসি মিলান কর্তৃপক্ষ; তাও আবার মূল স্ট্রাইকার হিসেবে! ব্যাপারটা সহজে হজম করতে পারেনি, সমালোচক থেকে শুরু করে এমনকি দলের সমর্থকরাও।
৩৮ থেকে ৩৯ পা দিলেও সেই স্ট্রাইকার অনায়াসে খেলে যাচ্ছেন নিজের চিরচেনা আক্রমণাত্মকভাবেই৷ শুধু খেলেই শান্ত হচ্ছেন না, নিজে গোল করার পাশাপাশি দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন প্রতি ম্যাচে, একাই। ৩৯ বছরে পা দিয়েও প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বেশ ভালোই ভুগাচ্ছেন। দলের আক্রমণভাগ কিংবা দলের ড্রেসিংরুমে বনের সিংহের মতোই ভয়ংকরী এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি। নাম তার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।
ইব্রাহিমোভিচ বেড়ে ওঠা গরিব ঘরের এক সন্তান হিসেবে। সুইডেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর মালমোর কেন্দ্রে একটি বিপজ্জনক আবাসন প্রকল্পে বসবাসকারী পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। নিজের বড় নাক সম্পর্কে আত্ম-সচেতন ছিলেন এবং স্বীকার করতেন যে তিনি মূলত বিনামূল্যে মধ্যাহ্নভোজনের জন্য স্কুলে যেতেন।
জ্লাতান ১৯৮১ সালের ৩ অক্টোবর সুইডেনের মালমো শহরের রোজনগার্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একটি অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে তার বাবা সেফিক ইব্রাহিমোভিচ ছিলেন একজন বসনিয়ান মুসলমান এবং মা জুরকা গ্রাভিয়াস ছিলেন ক্রোয়েশিয়ান ক্যাথলিক।
শৈশব থেকেই দারিদ্রতার মুখোমুখি হওয়া ইব্রাহিমোভিচ রোজগার্ডের গিরিপথে বেড়ে ওঠেন যেখানে তিনি বাচ্চাদের সাথে রাস্তায় মারামারি করতেন এবং বেঁচে থাকার জন্য স্থানীয় একটি দোকান থেকে চুরি করতেন। একবার তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:
যখন আমাদের নিজের জন্য কিছু প্রয়োজন হতো তখন আমরা যা করতাম তা হলো দোকানে গিয়ে চুরি করা।
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের শৈশব আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যখন তার জন্মের দুই বছরের সময় তার বাবা-মা’র বিচ্ছেদ ঘটে৷ এই ঘটনাগুলি এবং জীবনের বন্ধুরতা তাকে একটি শিক্ষা দিয়েছিল, এবং যা জ্লাতান-এর ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করেছিল। যা তাকে খুব অল্প বয়স থেকেই নিজেকে বড় করতে সাহায্য করেছিল এবং তাকে এমন এক ব্যক্তিরূপে পরিণত করেছিল যে, তাকে আর মাথা নিচু করতে হয়নি কোনো কিছুর জন্য।
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ একবার বলেছিলেন,
বাবা কখনোই আমার জন্য ছিল না। নিজেই নিজের দেখাশোনা করেছি। যা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।
মাত্র ছয় বছর বয়সে ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন। মালমো এফএফ ক্লাবে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত জ্লাতান স্থানীয় দলগুলির সাথে খেলতেন।
জ্লাতান অনেক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, তিনি শুধুমাত্র বিনামূল্যে খাবারের জন্য স্কুলে যেতেন। এমনকি তিনি স্কুলের এক ঝামেলাযুক্ত বাচ্চা ছিলেন। সুতরাং যখন বিদ্যালয়টি তাকে নজরদারিতে রাখার জন্য একজন বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ করেছিল, তখন সে আর অপমান সহ্য করতে পারলো না। একদিন ইব্রাহিমোভিচ বিকেলে ফুটবল খেলছিলেন এবং শিক্ষক তাকে খেলতে দেখছিলেন।
তিনি শিক্ষকের মাথায় লক্ষ্য করে একটি শক্তিশালী শট নিয়েছিলেন এবং এর কিছুদিন পরে শিক্ষককে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। সেই কাজ দ্বারা, জ্লাতান প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন যে তিনি কেবল নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন বিশ্বের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন না, পায়ে ফুটবল রেখে নিজের ইচ্ছায় এটি বাঁকাতেও পারেন।
দেখতে দেখতে আর কয়টা বছর পর যেন সেই ছোট্ট ইব্রাহিমোভিচ এর প্রফেশনাল ক্লাব ক্যারিয়ার, জাতীয় দল এর হয়ে মাঠ মাতান৷ মালমোর হয়ে প্রফেশনাল ক্লাব ক্যারিয়ারে পা রাখেন ইব্রাহিমোভিচ। ১৯৯৯ সালে মালমো এফএফ থেকে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এবং দুই বছর পরে আয়াক্সের সাথে চুক্তিবদ্ধ হোন। আয়াক্সের ইব্রাহিমোভিচ ইউরোপের অন্যতম নজরকাড়া স্ট্রাইকার হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং দুই বছর পরে জুভেন্টাসের সাথে চুক্তি করতে চলে গেলেন।
তিনি ২০০৬ সালে ঘরোয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার মিলানে যোগদানের আগে ডেভিড ট্রেজেগুয়েটের সাথে স্ট্রাইক অংশীদারিতে সিরি-এ’তে সেরা পারফরম্যান্স অর্জন করেছিলেন, যেখানে ২০০৮-০৯ সালে তিনি ক্যাপোক্যাননিয়েরে (সিরি এ টপ স্কোরার) জিতেছিলেন এবং টানা তিনবার সিরি-এ টাইটেল অর্জন করেছিলেন।
২০০৯ সালের গ্রীষ্মে, তিনি পরের মৌসুমে ইতালিতে ফিরে মিলানের সাথে যোগ দেওয়ার আগে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রান্সফারে বার্সেলোনায় আসেন ইব্রাহিমোভিচ। বার্সেলোনার হয়ে পাঁচটি ট্রফি জয় করেছিলেন ইব্রাহিমোভিচ। তিনি ২০১০-১১ মৌসুমে আরেকটি সিরি-এ শিরোপা জিতেছিলেন।
২০১২ সালের জুলাই মাসে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে যোগদানের আগে ইব্রাহিমোভিচ টানা চারটি লিগ ওয়ান খেতাবসহ বেশ কয়েকটি ট্রফি জিতেছিলেন এবং লিগ ওয়ান এর তিনটি সিজনে ছিলেন টপ গোল স্কোরার। ২০১৫ সালের অক্টোবরে, তিনি পিএসজির সর্বকালের গোলদাতা হোন।
২০১৬ সালে, তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফ্রি ট্রান্সফারে যোগদান করেছিলেন এবং তার প্রথম মৌসুমে এফএ কমিউনিটি শিল্ড, ফুটবল লীগ কাপ এবং উয়েফা ইউরোপা লীগ জিতেছিলেন। পরবর্তীতে ইব্রাহিমোভিচ আমেরিকান ক্লাব এলএ গ্যালাক্সিতে ২০১৮ সালে যোগদান করেন। চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে এসি মিলান এর হয়ে মাঠ কাঁপিয়ে ৪১ বছর বয়সে অবসর নেন এই ফুটবলার৷
জাতীয় দলের হয়ে ইব্রাহিমোভিচ
ক্লাব ফুটবল নয়, ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি তিনি জাতীয় দলের হয়েও পেয়েছেন সাফল্য। সুইডেন জাতীয় দলের ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ৬২ গোল করে সুইডেনের টপ গোল স্কোরারও এই ইব্রা। একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচের পর নিজের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে আজারবাইজানের বিপক্ষে গোল করেন এই স্ট্রাইকার এবং সুইডেনকে ৩-০ গোলের জয় উপহার দেন তিনি।
২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে সুইডেন দলের অংশ ছিলেন তিনি। ২০০৪ সালের ইউরোর প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ইব্রাহিমোভিচ দলের হয়ে একটি অ্যাসিস্ট এবং পেনাল্টি স্পট থেকে করেছিলেন একটি গোল। এভাবে একের পর এক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে করতে থাকেন গোল। একটা সময় ২০১৬ সালে এসে তিনি সুইডেন জাতীয় দলের হয়ে ৫০তম গোল করেন পাশাপাশি সুইডেনের টপ গোল স্কোরার বনে যান৷
ক্লাব ক্যারিয়ারেও করেছেন গোল সমান তালে। মালমো থেকে আয়াক্স এরপর জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান, বার্সেলোনা হয়ে মিলানে, পরবর্তীতে প্যারিস সেইন্ট জার্মেন, ম্যান ইউ, এলএ গ্যালক্সি হয়ে শেষমেশ মিলানে তিনি৷ ক্লাব ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে রয়েছে ৪০৫ গোল এবং জাতীয় দলে রয়েছে ৬২ গোল।
সবার চাইতে একটু ভিন্ন রকম গতি, একাগ্রতা, ক্ষিপ্রতা, পাগলা ভাব তাকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়। বল পায়ে ফুটবলের পাশাপাশি তার হাসি-ঠাট্টা সবাইকে যোগায় বিনোদন। তার আত্মজীবনীতে তিনি ছোটকালের একটি কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন,
আমি পুরো পৃথিবীর সামনে উঠে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম এবং যারা আসলেই আমাকে নিয়ে সন্দেহ করেছিল তাদেরকে দেখাতে চাই যে আমি আসলে কে,
আমি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।
Feature Image: pinterest.com Sources: 01. Ibrahimovic. 02. Zlatan Ibrahimovic. 03. Zlatan Ibrahimovic.